জাতিসংঘের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ভয়াল চিত্র

Spread the love

অনলাইন ডেস্ক: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের ভয়াল চিত্র উঠে এসেছে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশনের রিপোর্টে।

ওই রিপোর্টে রোহিঙ্গাদের বিশ্বের সর্ববৃহৎ দেশহীন সম্প্রদায় বলে বর্ণনা করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের পথ সুগম করতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে।

মিয়ানমারের সেনাদের হাতে রোহিঙ্গা নারীদের ব্যাপকহারে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর জাতিসংঘের কর্মকর্তারা একে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এসব অত্যাচার নির্যাতনের জের ধরে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের রোহিঙ্গাদের ঢল শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্তে। সে ঢলের গতি যখন কমে আসে ততদিনে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা ঠাঁই করে নিয়েছে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে।

বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের বয়ানে উঠে এসেছে রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনের ভয়াল বিবরণ। তবে রাখাইনে সাংবাদিক ও এনজিও কর্মীদের যাতায়াতে বিধি-নিষেধ থাকায় ভয়াবহ নির্যাতনের কম অংশই গণমাধ্যমে উঠে এসেছে ।

নির্যাতনের ভিডিও: নভেম্বর ২০১৬
রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্যাতনের একটি ভিডিও প্রকাশ হলে তীব্র শোরগোল তৈরি হয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিতে প্রথমেই দেখা যায়, রাস্তায় দু’জন কিশোরকে লাথি মারতে-মারতে এগিয়ে নিচ্ছেন একজন পুলিশ সদস্য।

এরপর দেখা যাচ্ছে, বহু পুরুষকে সারিবদ্ধভাবে মাটিতে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এদের সবার হাত মাথার পেছন দিকে উঠানো । তারপর এক ব্যক্তিকে মাটিতে বসিয়ে ক্রমাগত লাথি মারছে তিনজন পুলিশ সদস্য। একই সঙ্গে ওই ব্যক্তিকে লাঠি দিয়েও পেটানো হচ্ছিল।

ভিডিওটি প্রকাশ হওয়ার পর মিয়ানমারের কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে আটক করা হয় এবং পরে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে রোহিঙ্গা নির্যাতনে সে ঘটনাটির সাথে চারজন পুলিশ কর্মকর্তা জড়িত।

অং সান সু চির কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের আটক করা হয়েছে।

স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ: ৪০ গ্রাম পুড়ে ছাই
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায় যে, তারা স্যাটেলাইটে তোলা ছবি বিশ্লেষণের করে নিশ্চিত হয়েছে যে, রাখাইনে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ৪০টি গ্রামের ভবনসহ বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে বলে সংস্থাটি দেখতে পেয়েছে।

এ নিয়ে ৩৫৪টি গ্রাম আংশিক বা পুরোপুরি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে দাবি করে সংস্থাটি। ওই বছর ২৫শে নভেম্বর রাখাইনের মংডুর কাছে মিয়াও মি চ্যাঙ গ্রামে আগুন আর ঘরবাড়ি ধ্বংসের ছবি তুলেছে স্যাটেলাইট। পরের এক সপ্তাহের মধ্যে চারটি গ্রামে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।

গণকবরে ৪০০ লাশ:
বৃষ্টির মতো গুলি চালিয়েছিল মিয়ানমারের সৈন্যরা। ২০১৭ সালের অগাস্ট মাসে সেনাবাহিনীর অভিযানে রাখাইন রাজ্যের গু দার পিন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

স্যাটেলাইটের চিত্র এবং রোহিঙ্গাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তত পাঁচটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায় তখন।
এসব গণকবরে ৪০০’র মতো মানুষকে চাপা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিলো তখন বার্তা সংস্থা এপি।

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন রোহিঙ্গা যুবক নূর কাদির। নূর কাদির বলেছিলেন, কবরের ভেতরে মৃতদেহগুলোকে স্তূপ করে রাখা হয়েছিল।

যে গ্রামটির কথা বলা হচ্ছে, সেখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়নি মিয়ানমার সরকার। সুতরাং ঐ গ্রামে আসলে ঠিক কতজন মারা গেছে, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছিল এপি।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত নেতৃস্থানীয় রোহিঙ্গারা ৭৫ জনের মৃত্যুর তথ্য একত্রিত করেছিলেন। গ্রামবাসীরা বলছে, মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪০০’র মতো হবে।

যারা মারা গেছেন তাদের পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং সরাসরি মৃতদেহ দেখার ওপর ভিত্তি করে তারা এসব কথা বলছেন।

ওই গ্রাম থেকে যেসব রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে জীবন বাঁচিয়েছেন, তাদের ধারণা আগস্ট মাসের ২৭ তারিখের হত্যাকাণ্ড ছিল বেশ পরিকল্পিত। হত্যাকাণ্ড চালানোর জন্য সৈন্যরা শুধুই রাইফেল, ছুরি, গ্রেনেড এবং রকেট লঞ্চার আনেনি-সাথে এসিডও নিয়ে এসেছিল তারা।

ইন দিন গ্রামে গণহত্যা
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ১০ জন বন্দী মুসলিম পুরুষকে হত্যাকাণ্ডের জন্য আলোচিত ওই গ্রামটি।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অল্প যে কয়টি নির্যাতনের ঘটনা স্বীকার করে এটি তার একটি। ইন দিন গ্রামের তিন-চতুর্থাংশ বাসিন্দাই ছিলো মুসলিম, বাকিরা রাখাইন বৌদ্ধ।

এখন সেখানে মুসলিমদের কোন চিহ্ন নেই। রাখাইনরা চুপচাপ এবং শান্তিপূর্ণ। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ওই এলাকা ঘুরে এসে বিবিসির জনাথন হেড লিখেছিলেন, যেখানে রোহিঙ্গারা থাকতো সেখানে গিয়ে দেখা গেলো যে, কোন গাছপালা নেই। তার পরিবর্তে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া আর বিশাল সীমান্তরক্ষী পুলিশের ব্যারাক।

রাখাইনের বৌদ্ধ বাসিন্দারা বলছে যে, প্রতিবেশী হিসেবে মুসলিমদের আর কখনোই মেনে নেবে না তারা।
জাতিসংঘ একে জাতিগত নির্মূলের টেক্সটবুক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলো। আরও পরে এই ঘটনা স্বীকার করলেও প্রথমে নিজেদের বাহিনীর হাতে বড় মাত্রায় হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছিলো মিয়ানমার।

রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, ওই গ্রামে অভিযানের সময় রোহিঙ্গা পুরুষদের একটি দল নিজেদের জীবন বাঁচাতে একটি জায়গায় গিয়ে জড়ো হয়।

তখন ওই গ্রামের কয়েকজন বৌদ্ধ পুরুষ একটি কবর খনন করার নির্দেশ দেন। তারপর ওই ১০ জন রোহিঙ্গা পুরুষকে হত্যা করা হয়। বৌদ্ধ গ্রামবাসীরা অন্তত দুজনকে কুপিয়ে এবং বাকিদেরকে সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে।

এই প্রথম এধরনের হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে ছবি পাওয়া গেছে যাতে সৈন্যরা অভিযুক্ত হচ্ছেন। এ ঘটনা প্রকাশের পর রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করেছিলো মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।